পাঠ প্রতিক্রিয়া
বইয়ের নাম:- নিহত হওয়ার আগে ও পরে
লেখক:- পিয়া সরকার
প্রচ্ছদ:- সুমন সরকার
মুদ্রিত মূল্য:- 200
প্রকাশক- বেঙ্গল ট্রয়কা পাবলিকেশন
**I declare that all of the statements are my personal opinion. Your opinion may differ and I welcome that. May contain spoiler. Thank you.
প্রাককথন- পড়ে শেষ করলাম বর্তমান সময়ের অন্যতম সুলেখিকা পিয়া সরকারের ‘নিহত হওয়ার আগে ও পরে’। এটি একটি ইনভেস্টিগেটিভ থ্রিলার বা বলা ভালো রিভেঞ্জ থ্রিলার। তবে এটি পিয়া সরকারের অন্য দুই পুলিশ চরিত্র,দর্শনা’ অথবা ‘উমা’ সিরিজের অংশ নয়। এটি একটি স্বতন্ত্র এবং খুবই ছোট কাহিনী, মিনি কাহিনীও বলা যেতে পারে।

বিষয়বস্তু:- দীপ্ত একজন বড়ো রহস্য বা ক্রাইম থ্রিলার লেখক। কয়েক বছর আগে দূর্ঘটনার ফলে তার সাময়িক স্মৃতিভ্রংশ হয়। তবে ধীরে ধীরে স্মৃতি ফিরে আসতে থাকে। বহু বছর পর দীপ্ত, রায়া, সমীরণ ও রঞ্জন একত্রে মিলিত হয় যেখানে তাদের কলেজ ও হোস্টেল ছিল। এরপর জানা যায় সেই হোস্টেল সংলগ্ন এলাকায় কিছুদিন আগে একটি কঙ্কাল উদ্ধার হয়েছে। পরীক্ষার পর নিশ্চিত করা হয় যে কঙ্কালটি তাদেরই সহপাঠীর, যে কিনা এতদিন ফেরার ছিল। হঠাৎ এতগুলো বছর পর চারবন্ধু মিলিত হওয়ার সন্ধিক্ষণে কোন রহস্য ঘনীভূত হতে চলেছে? এই কঙ্কালের সঙ্গে এই চারজনের কী সম্পর্ক?
মতামত:- অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পিছনে মূলত দুটি কারণ থাকে। এক, অপরাধী এবং দ্বিতীয় তার পেছনে থাকা সেই ব্যক্তি যে অপরাধের মুখে ঠেলে দিয়ে অপরাধীর জন্ম দেয়। আইনের চোখে অপরাধী দোষী, সে সাজাও পায়। তবে সেই পর্দার আড়ালে থাকা ‘মেঘনাদ’ ? তার শাস্তি কি আইনের দরবারে হয় না নিয়তির দরবারে?
গল্পটির সবথেকে বড়ো পজিটিভ দিক হল, কাহিনী একদমই মেদবর্জিত। কোনো চরিত্র বা ঘটনাকে অযথা টেনে নিয়ে যাওয়া হয়নি। এছাড়াও কাহিনীটি অত্যন্ত বাস্তব। বরাবরই পিয়া ম্যাডাম তার কাহিনীতে সমাজের কোনো না কোনো অন্ধকার দিক তুলে ধরেন। এই গল্পেও তার ব্যাতিক্রম ঘটেনি। বয়ঃসন্ধির সন্ধ্যাকালে শারীরিক ও মাসনিকগত অত্যাধিক পরিবর্তন প্রত্যেকটা মানুষকে আলাদাভাবে প্রভাবিত করে। জীবনের অভিজ্ঞতা আমাদের সেই প্রভাব থেকে মুক্ত করতে সাহায্য করে। কিন্তু এই সময় যদি জীবনের অভিজ্ঞতাই সাথ না দেয় তবে সেই প্রভাব আবদ্ধ করে রাখে। সুন্দরভাবে সেই বিষয়টি কাহিনীতে মিশিয়ে দিয়েছেন। তাছাড়া ragging এর মতো সংবেদনশীল বিষয়বস্তু ছুয়ে গেছেন। এর প্রভাব যে মনের ওপর কতটা সুদূরপ্রসারী তা কল্পনার বাইরে। মনে হয় যেন, ওগুলো ছোটবেলার মজার মতই নিষ্পাপ! স্কুল, কলেজে এই ধরণের অভিজ্ঞতা হলেই নির্দেশ আসে, “তোর বন্ধু তো, একটু অ্যাডজাস্ট করে নে” জাতীয় পরামর্শ পালনের।
ইনভেস্টিগেশন যথাযথ, পুলিশের সাফল্যতা ও ব্যর্থতা দুইয়ের ব্যবহার করেছেন। গালির ব্যবহার করেছেন লেখিকা তবে কখনই সেটা মনে হয়নি অপ্রয়োজনীয়। তবে গল্পের প্রয়োজনে ১৮+ বিষয়বস্তু রাখা হয়েছে তাই এটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য।
তবে কয়েকটি জায়গায় আরো ভালো হতে পারত-
কথায় বলে সবচেয়ে সবল জায়গাটাই দূর্বলতম হয়। এক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। লেখাটি অত্যাধিক ছোট মনে হয়েছে। যে ন্যারেটিভ এবং ক্যারেকটার বিল্ডিংয়ের কারণে দর্শনাকে একজন রক্তমাংসের পুলিশ বলে মনে হয়েছিল এখানে কোনো ক্যারেকটারই ঠিক করে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। মনে হল যেন কিছুটা তাড়াহুড়ো করেই শেষ হয়ে গেল। দীপ্তকে বেশি স্পেস দেওয়া হলেও ‘রায়া’, ‘সমীরণে’র মতো চরিত্রগুলো কিছুটা উপেক্ষিত। রায়ার অবস্থান স্পষ্ট নয়। এমনকি তার প্রপার কোনো এন্ডিং রাখা হয়নি। এই কাহিনীর অপরাধী কে তা কয়েক পাতা পরার পরেই বোঝা যায়। এমনকি সেই ‘মেঘনাদ’ রূপী অপরাধীকেও প্রথম থেকেই চেনা যায়। এটা ঠিক ‘হুডানিট'(whodunit) হয়ে ওঠেনি।এইসব কারণে এটা পুলিশ প্রসিডিউর অপেক্ষা রিভেঞ্জ থ্রিলার হিসেবেই পরিবেশিত হয়েছে বলে মনে হয়েছে।
এছাড়া পুলিশি তদন্তে কিছুটা ফাঁক লক্ষ্য করা যায়। ফেরার হলে আসামিকে তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয় কিন্তু হোস্টেল সংলগ্ন জঙ্গল, যেখান থেকে কঙ্কাল পাওয়া যায় সেটা ঠিক মনঃপূত হল না। শ্যামলালের যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রাখা হয়েছে তাতে মানিব্যাগ, অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ঘরে দেখেও তখন সন্দেহ না হওয়াটাও ঠিক মনে ধরেনি।
বইটিতে অলঙ্করণ নেই, দু-তিনটি বাক্যে প্রমাদ চোখে পড়েছে। তবে সংবেদনশীল বিষয়গুলি শুধুমাত্র ছু্ঁয়েই বেরিয়ে গেছেন। আরো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা আশা করেছিলাম, যেমনটা ‘নিষাদে’ দেখেছি।
তবে এই কথাটা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে এটি পিয়া সরকারের প্রথম দিকের একটি লেখা। এত ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও বইটিকে বেশ উপভোগ্য করে তুলতে পেরেছেন। বিশেষ করে, যে দুটি বিষয় বেছে নিয়েছেন সেটা নিয়ে বাংলায় খুব কম কাজ করা হয়েছে। এইজন্যই পরবর্তীতে দর্শনা বোসের মতো সফল ও জনপ্রিয় চরিত্রের কাহিনী উপহার দিয়েছেন। যদি কেউ প্রথমবারের জন্য পিয়া ম্যাডামের লেখা পড়তে শুরু করতে চায়, তবে এই থ্রিলারটি দিয়েই পরিচয় করানো উচিত। সবমিলিয়ে পিয়া সরকারের অন্যান্য লেখার কাছে কিছুটা ফিকে হলেও যথেষ্ট উজ্জ্বল। টানটান থ্রিলিংয়ের জন্য পাশ মার্কস দেওয়াই যায়।
ব্যাক্তিগত রেটিং- 7/10