হঠাৎ বেডরুমে একটা আলোর শিখা। কোনও মোমবাতি নয়। দেশলাইও নয়। শুধু শূন্যে ভেসে থাকা একটা আগুনের শিখা এগিয়ে আসছে। অন্ধকার এক জিনিস। কিন্তু অন্ধকারে বিন্দুমাত্র আলোর ইশারা এলেই ছায়াগুলো প্রাণ ফিরে পায়। নড়েচড়ে সৃষ্টি করে এক অশরীরী আবেশ। তাতে পাঁজরের হাড়গুলোতে কনকনে বাতাস লাগে। হৃৎপিন্ডে শব্দ ওঠে – ধুক ধুক। পছন্দসই অলৌকিক বা হরর জঁরের এমন লেখা খুব একটা পাওয়া যায়না যা ভয়ও পাওয়াবে আবার লেখার সাথে জড়িয়েও রাখবে একইসঙ্গে। অভিষেক চট্টোপাধ্যায়ের পাতালকুহেলি ঠিক এমনই একটা লেখা। যার ভৌতিক লেখা এখন আমার ভীষণ পছন্দের। তেরো নম্বর ফ্লোর এবং মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – সেই যেমন ভয়ানক অভিজ্ঞতার জাল বিস্তার করেছিল, এই লেখাটিও সেরকম অনুভূতি দিতে পারে অনেকটা। রাহুল, প্রমিত আর আভেরী – তিনজনের এক অদ্ভুত সম্পর্কের সমীকরণে জড়িয়ে রয়েছে এই উপন্যাসের সূত্রপাত। কলেজের বন্ধুত্ব, বিকৃত ভাবনার ভালবাসা এবং রাতের সেমেট্রিতে ভালবাসার পরীক্ষার খেলা তিনজনের জীবনে নিয়ে আসে পরিবর্তন, ভয় এবং রম্যাণী গোস্বামীকে। আভেরীর হাজ়ব্যান্ড সৌম। সে পাহাড়ে বেড়াতে গেছে তাদের বিবাহবার্ষিকীতে। কিন্তু হঠাৎই ফিরে আসে সে। দ্বিতীয়বার সারপ্রাইজ় দিতে। কিন্তু হঠাৎ একটু বেশিই ভালবাসছে কী সৌম? নাকি তার জীবনের ফেলে আসা সেই অধ্যায় আবার নতুন ভাবে লিখতে শুরু করে তার কাহিনী! রম্যাণী সাইকোলজির প্রফেসর একইসাথে প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর। স্বপ্ন তাকে আভাস দেয় ভবিষ্যতের। দেখতে পায় ঘটতে চলা অশুভকে। সে স্বপ্নে দেখে এক পাগলকে। যে বারণ করছে এক মেয়েকে বাজারে যেতে, তার বিপদ! কিন্তু সেই মেয়েটিকে চেনেনা রম্যাণী! তবে দৈব ইচ্ছা মিলিয়ে দেয় তাদের। সাথে তার ধূসর অধ্যায়কে, ভয়কে। স্নান করতে করতে আভেরীর সামনে এসে যায় এক বীভৎস ফ্যাকাশে সাদা মুখ। রম্যাণীর সাথেও ঘটে একই ঘটনা। বাথরুমের আয়নাতেই। কিন্তু কেন হচ্ছে দুই মেরুর দুজনের সাথে একই ঘটনা? আর আছে কৃষ্ণদাস মোহান্ত। কে সে? এবং রম্যাণী ও সে কীভাবে জড়িয়ে যায় এই অশুভ শক্তির খেলায়! নাকি কেউ বলে রেখেছিল আগে থেকেই এই ভবিষ্যত! যেমন পাহাড়ের সেই পাগল বলেছিলে, ফিরে আসতেই হবে আবার এখানে। যেখানে রয়েছে তাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া রাত আর সেই পাহাড়ের ত্রাস – জনের কবর। ভয়ের সাথে সাথে এই উপন্যাসে রয়েছে এক মনস্তাত্বিক দিক। যা ঘিরে থাকে সমগ্র উপন্যাসেই। একটি ভীষণই আকর্ষণীয় আঙ্গিক রয়েছে এই উপন্যাসটিতে। হিন্দুতন্ত্র এবং খ্রিস্টীয় এক্সরসিজম – এই দুই মিলে বেশ এক নতুনত্ব পাওয়া যায় গল্পে। এবং যেভাবে সেটিকে ব্যবহার করা হয়েছে, বেশ উপভোগ্য সেই বর্ণনা। রাহুল এবং প্রমিত সাথে তাদের মা বাবা – এই সম্পর্কের সাথে যে সমীকরণ এবং যে টুইস্ট এর ব্যবহার করেছেন লেখক সেটি বেশ ভাল ভাবে স্থাপন করতে পেরেছেন। কয়েকটি বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত কিছু মতামত রয়েছে। যেমন – মিস গোমস চরিত্রটি আরও ভাল পরিণতি পেতে পারত। সমগ্র লেখাটি বেশ উপভোগ্য, ছেড়ে উঠতে দেয়না একেবারেই। তা সত্ত্বেও থ্রিল এবং জমাটি ব্যাপারটা একটু নুন কম ধরনের লেগেছে। যেমন প্লট ছিল, সেই হিসেবে আরও একটু রহস্যময়তা, থ্রিল যোগ করা যেত কোথাও যেন। বুনির সাবপ্লটটিতে আর একটু রহস্য, ভয়ের ঘনত্ব যোগ করলে মন্দ হত না। তবে সমগ্র উপন্যাসটি যেভাবে আমার মত টানা পড়তে না পারা পাঠককে একটানা পড়িয়ে নিয়েছে সেটাই বলে দেয় কতটা উপভোগ্য এই কাহিনীর বিস্তার। কিন্তু সুমিত্র এবং বুনি কি একই সুতোয় বাঁধা? নাকি অপেক্ষা করছে কোনও এক শক্তিশালী নতুন নেগেটিভ এন্টিটি! কৃষ্ণদাস, চন্দ্রহাস, মিস গোমস্-রা কি আবার ফিরবে? কারণ – ঘটনা শেষ, রহস্য নয়। পাতালকুহেলি – অভিষেক চট্টোপাধ্যায়।
“পাতালকুহেলি” একটি ভৌতিক থ্রিলার, ভুত প্রেত এবং তার সঙ্গে আর ও কিছু রহস্য.. সাথে রয়েছে রম্যানি গোস্বামী, যে সব ঘটনার প্রাকৃতিক কোনো ব্যাখ্যা নেই তা নিয়েই রম্যানির খোঁজ করা.. গল্পে রয়েছে আভেরী, প্রমিত, রাহুল যারা তিন বন্ধু এবং তাদের পরিবার। ঠাট্টা মজা থেকে কিভাবে জীবনে ভয়ংকর অভিশাপ নেমে আসে রয়েছে তার গল্প। অন্যদিকে রম্যানি প্রায়ই একই খারাপ স্বপ্ন দেখে এবং তার কারণ খোঁজে, আর সেই ভাবেই একদিন জড়িয়ে পড়ে আভেরীর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার সাথে.. শুধু প্রেত পিশাচ নয়, রয়েছে কিছু মানুষের প্রতিশোধ নেওয়ার গল্পও পড়ে তোমাদের কেমন লাগলো জানিও
গল্পসংক্ষেপ: তিন কলেজছাত্রের অদূরদর্শিতা আর অবিশ্বাসের ফলশ্রুতিতে জেগে ওঠে এক পিশাচশক্তি। অন্যদিকে, রম্যানির জীবন জড়িয়ে যায় রহস্যময় স্বপ্নের জালে— স্বপ্নে কারুর যেন বিপদের আভাস পায়। কে সে? আভেরি, সৌম্য আর রম্যানি ধীরে ধীরে আবর্তিত হন এক ভয়ঙ্কর রহস্যের কেন্দ্রে। প্রশ্ন একটাই: রম্যানি কি তার বন্ধুদের বাঁচাতে পারবে? নাকি এই অশুভ শক্তি সবাইকে টেনে নেবে কোনো অন্ধকার গহ্বরে? গল্পের শেষ পাতায় পৌঁছে উত্তর জানলেও, যাত্রাপথের প্রতিটি মোড় আপনাকে স্তব্ধ করে দেবে। নিজস্ব রিভিউ: অভিষেকবাবুর কলমে গল্প বলার শৈলী যেন এক hypnosis—ধীরে ধীরে পাঠককে টেনে নেয় গভীরে। শুরুটা নিঃশব্দে জমে ওঠা তুষারের মতো, কিন্তু মধ্যবর্তী অংশ থেকেই তা গলতে শুরু করে স্রোতে পরিণত হয়। আর ক্লাইম্যাক্সে মিশে যায় হিন্দু তন্ত্র ও খ্রিস্টান ধর্মের আচার—এক কথায় অনবদ্য! অতিপ্রাকৃতের সঙ্গে বাস্তবের সমান্তরাল টানাপোড়েন, চরিত্রদের মানসিক দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে গল্পের ফ্রেমওয়ার্ক পাকা। উজ্জ্বল দিক: · এতদিন ভৌতিক গল্পতে বৌদ্ধতন্ত্র ও হিন্দু তন্ত্রমন্ত্র মেলবন্ধন দেখেছি কিন্তু এই গল্পে হিন্দু ও খ্রিস্টান রীতিনিতি উঠে এসেছে, এই মিশ্রণ বাংলা সাহিত্যে নতুন। · রম্যানির দ্বির মানসিকতা, আভেরির জেদ, সৌম্যের যুক্তিবাদী মন—প্রত্যেকেরই লেয়ারড পার্সোনালিটি পাঠককে জুড়ে রাখবে। · শিশুমনে হিংসতার প্রভাব, বিকৃত ভালোবাসা কীভাবে অদূর ভবিষ্যতে প্রভাব বিস্তার করে এই গল্পতে সেটা ভালো ভাবে বোঝানো হয়েছে। · “বুনি” নামের রহস্যময় শিশুটির উপস্থিতি পরবর্তী বইয়ের জন্য উসকানি দিয়েছে চমৎকারভাবে। আমরা সবাই অধীরআগ্রহে অপেক্ষা করে থাকবো সমিত্রার মৃত্যু কি ভাবে হয়েছিল সেটা জানার জন্য। কিছুটা আক্ষেপ: · গল্পে অনেক চরিত্র বর্ণিত আছে কিন্তু তিনটি প্রধান চরিত্র ছাড়া আর কেউ কোনভাবে দাগ কাটেনা। · মিসেস গোমজ এর রহস্যময় দিক খুব ভালো করে প্রথমে লেখা হলেও শেষে অনেক প্রশ্নের উত্তর পেলামনা। · গল্পের কিছু ঘটনা predictable and repetitive মনে হয়েছে। · গল্পে অনেক ঘটনা এমন ভাবে বর্ণিত হয়েছে যেটা এখনকার দিনে ঘটা বিরল। অনেক কিছু সমাপতন হয়েছে কিন্তু এগুলো suspension of disbeliefহিসাবে মেনে নেওয়া যায় গল্পের তাগিদে। · বইটির ডাস্ট জ্যাকেটের মান খুব ভালো নয়, পাতার গুণগত মানও উন্নত হতে পারত, এবং অভ্যন্তরে কোনো ইলাস্ট্রেশন নেই, যা গল্পের পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ করতে পারত। মোট মূল্যায়ন: “পাতালকুহেলি” শুধু ভৌতিক গল্প নয়—একটি সাইকোলজিক্যাল, ভৌতিক থ্রিলার যেখানে অতিপ্রাকৃতের পাশাপাশি কাজ করে মানবমনের অন্ধকার। অভিষেকবাবুর গল্প বলার ঢং, গবেষণা, আর চরিত্রদের প্রাণবন্ত উপস্থাপন বইটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। হরর-থ্রিলার প্রেমীদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য। এখনকারদিনের লেখা অন্যান্য ভৌতিক গল্পের থেকে এটিঢের ভালো। পরবর্তী বইয়ের জন্য উৎকণ্ঠা রইল—”বুনি”র রহস্য কী, সেটাই এখন জানার অপেক্ষা! রেটিং: ½ (3.5/5)
ধরণ: হরর থ্রিলার (Paranormal Investigator Romany সিরিজের প্রথম বই) এই বছর কলকাতা বইমেলা ২০২৫-এ সদ্য প্রকাশিত “পাতালকুহেলি” হাতে পেয়েই পড়ে শেষ করলাম.অভিষেক চট্টোপাধ্যায় এর আগে “তেরো নম্বর ফ্লোর” এবং তার সিক্যুয়েল “মৃত্যুজ্যোৎস্নার রাত্রী” পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম, তবে এবারের এই উপন্যাসটি যেন আরও এক ধাপ এগিয়ে। এটি লেখকের “Paranormal Investigator Romany” সিরিজের প্রথম বই, যেখানে ভৌতিক ঘটনা ও থ্রিলার-রহস্য মিলেমিশে এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কাহিনির সংক্ষিপ্ত পরিচয় (Storyline) [ বেশি লিখলাম না , spoiler হয়ে যাবে , blurb এর ছবি দিয়ে দিলাম পোস্ট এ ] তিনজন কলেজ শিক্ষার্থীর অজ্ঞতা ও অবিশ্বাসের জেরে জেগে ওঠে এক ভয়ংকর পিশাচশক্তি। এদিকে র্যমাণি প্রায়ই কিছু অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে, যেগুলো মাঝে মাঝে ভবিষ্যদ্বাণীমূলক (premonition) হয়ে দেখা দেয়। ধীরে ধীরে ঘটনার জালে জড়িয়ে পড়ে আবেরি, সৌম্য আর র্যমাণি—সব মিলিয়ে তাদের সামনে একটাই প্রশ্ন: র্যমাণি কি পারবে বন্ধুদের এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে? নাকি সেই অশুভ শক্তি সবাইকে টেনে নিয়ে যাবে কোনো অন্ধকার পাতালে? কে বা কী এই পিশাচশক্তি, কেনই বা সে এত ধ্বংসাত্মক—সব উত্তর জানতে আপনাকে পড়তে হবে “পাতালকুহেলি”। হরর, থ্রিল ও ধর্মীয় নানা আচার-অনুষ্ঠানের সমন্বয়ে বইটি পাঠককে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টানটান উত্তেজনায় ধরে রাখবে। পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখনশৈলী ও গল্পের গতি বইটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮৬ পাতা, কিন্তু কোথাও তাড়াহুড়ো করা হয়নি। শুরুতে ধীরে ধীরে প্লট গড়ে তোলা হয়েছে—রহস্যের সূক্ষ্ম জাল বোনা হয়েছে সুপরিকল্পিতভাবে। মধ্য ভাগ থেকে ক্রমে সেই জাল ছাড়ানোর পাশাপাশি উত্তেজনা আর আতঙ্কের পারদ চড়তে থাকে। লেখক একদিকে যেমন হিন্দু তন্ত্রের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন, তেমনি খ্রিস্টীয় এক্সরসিজমের বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। হরর ও থ্রিলারের মিশেলে এই উপস্থাপন এক কথায় চমৎকার, বিশেষ করে ক্লাইম্যাক্স অংশে দু’দিকের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে দেখা যায়। ভালো লাগার দিক দুটি ধর্মীয় আচার (হিন্দু তন্ত্র ও খ্রিস্টান এক্সরসিজম) সমান মাত্রায় রাখা হয়েছে, যা সাধারণত কমই দেখা যায়। প্লট তৈরির ধরণ ধীর অথচ স্বার্থক; প্রতিটি অধ্যায়ে ধাপে ধাপে রহস্য উন্মোচন করে উত্তেজনা বজায় রেখেছে। চরিত্র বিকাশ বেশ যত্নসহকারে করা হয়েছে। আবেরি, সৌম্য, রোমানি—প্রত্যেকেই আলাদা স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব নিয়ে উপস্থিত। গভীর বার্তা: ছোটবেলা থেকে ভুল শিক্ষা বা গৃহস্থালির সহিংসতার নেতিবাচক প্রভাব যে শিশুমনে কতটা ভয়াবহভাবে আঁচড় কাটতে পারে, সেটিও গল্পের ফাঁকে উঠে এসেছে। পরবর্তী অংশের ইঙ্গিত: “বুনি” নামের একটি শিশুর প্রসঙ্গ নিয়মিত উঠে এলেও মূল গল্পে তেমন সম্পৃক্ততা ছিল না। শেষ পৃষ্ঠায় এসে বোঝা গেল যে এটি পরবর্তী সিক্যুয়েলেরই ইঙ্গিত—যা ভবিষ্যৎ কাহিনির প্রতি কৌতূহল অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়। কিছুটা বিড়ম্বনা মিসেস গোমেসের চরিত্র শেষের দিকে কিছুটা অপ্রয়োজনীয় ও বিরক্তিকর মনে হতে পারে; তাঁর ভূমিকা আরেকটু স্পষ্ট হলে সম্ভাবনা আরও পরিপূর্ণ হতো। আরও কিছু প্রত্যাশা: ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, তন্ত্রের বিভিন্ন অনুষঙ্গ আরেকটু বিস্তৃতভাবে দেখালে বা প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেশনের অংশে আরও কিছু আধুনিক গ্যাজেট ও কৌশল অন্তর্ভুক্ত করা হলে গল্পের সাসপেন্স ও উত্তেজনা আরও এক ধাপ বাড়তে পারত। সার্বিক মূল্যায়ন “পাতালকুহেলি” নিঃসন্দেহে এক দুর্দান্ত হরর থ্রিলার, যেখানে অতিপ্রাকৃত রোমাঞ্চ ও রহস্যের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের গূঢ় বার্তাগুলোও উঠে এসেছে। বিশেষ করে হিন্দু তন্ত্র ও খ্রিস্টান এক্সরসিজমের সমান্তরাল উপস্থিতি গল্পে অভিনব মাত্রা যোগ করেছে। ভৌতিক ও থ্রিলারধর্মী উপন্যাস পছন্দ করলে এটি অবশ্যই আপনার পছন্দের তালিকায় রাখতে পারেন। আমি এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি সিরিজের পরবর্তী কাহিনির জন্য, যেখানে হয়তো “বুনি” নামের বাচ্চা মেয়েটির গল্প আরও বিস্তারিত ভাবে জানব। আমার রেটিং: ৯/১০ যারা ইতোমধ্যেই বইটি পড়েছেন বা পড়ছেন, আপনারা কেমন উপভোগ করছেন জানাতে ভুলবেন না! আর লেখক Avishek Chattopadhyay -এর উদ্দেশ্যে বলি—এই সিরিজের বাকি হরর থ্রিলার গুলো পড়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।
বিষয়-সংক্ষেপ : হোটেল রিভার-শাইনে খুন হয় দীপিকা পোদ্দার নামে এক কলেজ স্টুডেন্ট । তদন্তে উঠে আসে – সে ব্লু-ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সাথে জড়িত ছিল । খুনিকে খুব সহজেই ধরে ফেলে পুলিশ । তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জানতে পারে – কোলাঘাট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ‘শিবাশিস সান্যাল’ নামের একজন স্টুডেন্টের সাথে এই ধরণের ভিডিওগুলো শ্যুট করত দীপিকা । পুলিশ শিবাশিসকে অ্যারেস্ট করতে গিয়ে দেখে সে আগেভাগেই পালিয়েছে । এই ঘটনার ১২ বছর পর একটি রিইউনিয়নে জড়ো হয় কোলাঘাট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের চার বন্ধুর এক গ্রুপ । তাদের কথোপকথন থেকে জানা যায় শিবাশিস সান্যাল তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুবৃত্তেরই একজন সদস্য ছিল । এইসময় চার বন্ধুর মধ্যে একজন, রঞ্জন জানায় – দু’মাস আগে কলেজের পিছনদিকের এক জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয়েছে একটা কঙ্কাল, পুলিশ সনাক্ত করেছে ঐ কঙ্কাল শিবাশিসের । এইবার ঐ চার-বন্ধু সন্দেহের তীর ছুঁড়তে শুরু করে একে অপরের দিকে । অন্যদিকে সমান তালে চলতে থাকে পুলিশি তদন্ত । কে খুন করেছিল শিবাশিসকে ? এত বছর পর কলেজের পিছনের জঙ্গল থেকে শিবাশিসের লাশটা উঠেই বা এল কিভাবে ? কোন কাহিনী লুকিয়ে আছে এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে ? প্রতিক্রিয়া : এই উপন্যাস দুর্দান্ত একটি ক্রাইম থ্রিলার, সাথে আছে ‘ডিটেকটিভ’ গল্পের টাচ্ । একটি রিইউনিয়ন, চারটি মূল চরিত্র এবং তাদের অন্ধকার অতীত – এই প্রেক্ষাপটে গল্পটি সাজিয়েছেন লেখিকা । প্রতিটি চরিত্র তৈরি করেছেন সুনিপুণভাবে । ছোট্ট প্লট এবং কাহিনী বিন্যাস খুব সীমিত পরিসরের হওয়া সত্ত্বেও, উপন্যাসটি বেশ জমজমাট । এই উপন্যাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হল – রহস্য সমাধান হয়ে যাওয়ার পরের অংশটি, যেখানে লেখিকা পাঠককে প্রবেশ করিয়েছেন মূল অপরাধীর মনের ভিতরে । ‘কেন’ – এই প্রশ্নের উত্তর জানতে পেরে ‘ঠিক-ভুল’, ‘ভালো-খারাপ’, ‘ন্যায়-অন্যায়’ – সবকিছু এলোমেলো হয়ে গিয়ে পাঠক ‘হতবাক’ হয়ে রয়ে যাবে । ‘নিহত হওয়ার আগে ও পরে’ উপন্যাসটি ‘প্রাপ্তমনস্ক’ পাঠকদের জন্য একটি ‘পারফেক্ট’ ক্রাইম থ্রিলার ।
চার বন্ধু ১২ বছর পর রিইউনিয়ন এ এসে জড়িয়ে পরে ২০০৮ এ ঘটে যাওয়া একটা খুনের তদন্তে। কলেজ এর পিছনের পুকুরে উদ্ধার হয় তাদের এক সহপাঠীর কঙ্কাল। কঙ্কাল এর গলায় যে প্যাঁচানো দড়ি সেটা এরা চারজনেই চিনতে পারে। তাহলে খুন টা কে করেছে? কলেজ জীবন, বন্ধুত্ব, লেগ পুলিং সমস্ত কিছুই আমাদের জীবনে কখনও মধুর আবার কখনও বিষাদ স্মৃতি বহন করে। নিঃসন্দেহে লেখিকা এক টানটান মার্ডার মিস্ট্রি খুব সুন্দরভাবে পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন। তবে এটাকে স্রেফ straightforward মার্ডার মিস্ট্রি ভাবলে ভুল হবে।এটি আসলে একটি মৃত্যু কে কেন্দ্র করে কিছু চরিত্রের গল্প , শুরু থেকে যার উদ্দেশ্যে রহস্য উদ্ঘাটন নয়, কিন্তু চরিত্রগুলোর মনের গভীরের গ্রে এরিয়ার ফটোকপি তুলে আনা, এবং পাঠকের হাতে বিচার ছেড়ে দেওয়া। তবে আমার মনে হয়েছে—গল্পটা একটু বেশি স্লিম হয়ে গেছে ডায়েট করে। গদ্যে একটু মেদ, চরিত্রগুলোর আরও ব্যাক স্টোরি থাকলে সংযোগটা আরও গভীর হতো। বাংলার থ্রিলার ঘরানায় এমন নতুন ঢংয়ের লেখা সত্যিই ফ্রেশ লাগলো। যারা চরিত্র-কেন্দ্রিক থ্রিলার ভালোবাসেন, তাদের জন্য রেকমেন্ড করবো। Bookstagram- @boikit_jeet পার্সোনাল রেটিং – ৩.৫/৫
‘ বৃশ্চিকচক্র ‘ ও ‘ নিষাদ ‘ এর পর লেখিকার আবারও একটা unputdownable তবুও অনালোচিত স্বল্পায়তন থ্রিলার পড়া শেষ হল। পড়তে পড়তে কখন শেষ হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। গল্পের অসম্ভব গতি শেষ অব্দি বসিয়ে রেখেছিল। ফলত, one sitting এই বইটা পড়া শেষ হয়ে গেল। কলেজ জীবনের চার বন্ধু রঞ্জন, রায়া, দীপ্ত ও সমীরণের reunion হয় তাজপুরের সমুদ্র সৈকতে। সেখানে রঞ্জন জানায় যে, তাদেরই কলেজের এক নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সহপাঠীর কঙ্কাল উদ্ধার হয়েছে তাদেরই কলেজের পেছনের পরিত্যক্ত বাগান থেকে ১২ বছর পর। সেই মৃত্যু রহস্যের উন্মোচন করতে গিয়ে প্রকাশ পায় অনেক পুরোনো হিসেব নিকেশ। প্রেম, প্রত্যাখ্যান, স্বার্থপরতা, নির্যাতন এবং সবশেষে বন্ধুত্বের অমর্যাদা সব কিছু নিয়ে এক জমজমাট টানটান থ্রিলার। ঘটনার ডিটেলিং থেকে শুরু করে খুব স্বল্প পরিসরে খুনীর উদ্দেশ্য, খুন সব কিছু নিয়ে এরকম নিখুঁত বর্ণনা খুব কম থ্রিলারে পেয়েছি এযাবৎ…এই কৃতিত্ব অবশ্যই লেখিকার। দর্শনা বোস সিরিজ ছাড়াও লেখিকার অন্যান্য লেখার সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য এই বইটা পড়া যায়। ধন্যবাদ
আজ সকালের সঙ্গী ছিল পিয়া সরকারের এই সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার বইটি। থ্রিলার আমার বরাবরই প্রিয়, সেখানে এরকম কাহিনী হলে শেষ না করে ওঠা যায় না। টানা ৩ ঘন্টা পড়ে শেষ করেছি বইটি। দারুন একটা গল্প পড়লাম। সাক্ষী হলাম এক অন্ধকার অতীতের। কোলাঘাট থানার এস.এইচ.ও সন্ধ্যেবেলায় থানায় বসেছিলেন, হঠাৎ থানার ফোনে খবর আসলো হোটেল রিভার শাইনে দীপিকা পোদ্দার নামে একটি কলেজ স্টুডেন্ট খুন হয়েছে। ব্লু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতো কলকাতার বিখ্যাত কলেজের ছাত্রী দীপিকা পোদ্দার আর কোলাঘাট ইঞ্জিনিয়ারিং করেজের ছাত্র শিবাশিস স্যান্যাল। পুলিশের রেইড পড়ে শুটিং বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীপিকা টাকার জন্য ব্ল্যাকমেল করতে থাকে যার দোকান থেকে ভিডিও আপলোড করা হতো সেই ব্যক্তি অর্থাৎ শিন্টু নামে একটি ছেলেকে। ব্ল্যাকমেলের মাত্রা ছাড়ালে শিন্টু দীপিকার সাথে বোঝাপড়া করে নেওয়ার জন্য মিটিং ফিক্সড করে এবং কথা কাটাকাটির ফলে মাথা গরম হয়ে যাওয়ায় সে দীপিকাকে খুন করে। কিন্তু সেই রাতেই আবার গায়েব হয়ে যায় দীপিকার সাথে ভিডিওতে কাজ করা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র শিবাশিস স্যান্যাল। পুলিশ তদন্ত করতে গিয়ে শিবাশিসের হদিশ না মেলায় তারা ভেবেছিল সে হয়তো এই খুনের সঙ্গে যুক্ত এবং ধরা পড়ার ভয়ে সে কলেজ থেকে পালিয়েছে। কিন্তু ঠিক ১২ বছর বাদে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পেছনের জঙ্গল থেকে তারই মৃতদেহ পাওয়া যায়। পুলিশের জেরায় শিন্টু স্বীকার করেছে যে, দীপিকাকে খুন সেই করেছিল, কিন্তু শিবাশিসকে নয়। তাহলে শিবাশিসকে হত্যা করলো কে? অন্যদিকে দীপিকা পোদ্দার খুনের ১২ বছর পর একটি রিইউনিয়নে জড়ো হয় কোলাঘাট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পুরোনো চার বন্ধুর এক গ্রুপ। তাদের কথপোকথন থেকেই সামনে আসে শিবাশিস স্যান্যাল তাদের গ্রুপেরই একজন সদস্য ছিল। এখান থেকেই শুরু হয় আসল খেলা। একদিকে চলতে থাকে পুলিশি তদন্ত আর অন্যদিকে সন্দেহের তীরে বিঁধতে থাকে চারজন তাদের গ্রুপের একে অপরকে। কে এবং কেন খুন করেছে শিবাশিসকে? সন্দেহের কাঁটা ঘোরে কার দিকে? দায়ী কে এই খুনের জন্য? কাহিনী খুব ছোটো পরিসরের। তবে এর মধ্যেও লেখিকা কাহিনীটিকে এতো সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন যার প্রসংশা না করে পারা যায় না। বিশেষ করে শেষের অংশটিতে পুরো হতবাক হয়ে গেছি আমি। পাঠকদের বলবো বইটি অবশ্যই একবার পড়ে দেখবেন। ভালো লাগবে আশা করি।
ছোট্ট বই।কিন্তু উত্তেজনা ভরপুর।যেনো আমাদের জীবন।সময় কম কিন্তু বড়োই গতিশীল। এটা একটা থ্রিলার। কয়েকটা খুন। কয়েকজন বন্ধু।আর তাদের জটিল সম্পর্ক।সৌন্দর্য,লোভ,প্রতিহিংসা,মাদকদ্রব্য,আর বাকি আদিম রিপুদের আনাগোনা।পাঁচজন প্রাণের বন্ধু।একজন খুন হলো।কিন্তু বাকি চারজন এর কি ভূমিকা সেই খুনের পিছনে? সম্পর্কের টানাপোড়েন,যৌনতা,বন্ধুত্ব,আর ভাঙন লেখনীতে ফুটে উঠেছে গভীর ভাবে।আর আছে তথাকথিত “নপুংসক”দের উপর চিরাচরিত অত্যাচার।শারীরিক,মানসিক,সামাজিক। স্মৃতিবিভ্রম কথা পরে মনে হয় এ যেনো আমাদের প্রত্যেকের মনের গোপন ইচ্ছে।আমরাও তো মুছে ফেলতে চাই আমাদের স্মৃতির কিছু অংশ।চিরতরে।শুধু বিশেষ কিছু অংশ। যাক আর হেয়ালি করবো না।বইটা পারলে পড়ে দেখবেন।
: নিহত হওয়ার আগে ও পরে : Piya Sarkar : বেঙ্গল ট্রয়কা পাবলিকেশন : ৪.২৫ / ৫ পিয়া সরকারের নিহত হওয়ার আগে ও পরে বইটি প্রথম পড়া শুরু করেই বুঝে গিয়েছিলাম—এটি এক বসায় শেষ না করে ওঠা যাবে না। করুণাময়ী থেকে বর্ধমানগামী বাসে বইটি খুলেছিলাম, আর দমদম পেরিয়ে ডানলপ পৌঁছানোর মধ্যেই ১১২ পাতার এই উপন্যাস শেষ! এত দ্রুত পড়ে ফেলার পেছনে একটাই কারণ—গল্পের টান। নাতিদীর্ঘ এই উপন্যাসে লেখিকা বন্ধুত্ব, প্রেম, হিংসা ও রহস্যকে এমনভাবে বুনেছেন যে কোথাও আলাদা করে কিছু চোখে পড়ে না, বরং সবকিছু মিলেমিশে একটি পূর্ণাঙ্গ আবহ তৈরি করেছে। সাধারণত বড় উপন্যাসে চরিত্রায়ন, রহস্যের স্তর নির্মাণ বা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্য বেশি পরিসর থাকে। কিন্তু এত কম পরিসরেও লেখিকা গল্পকে যত্নে গুছিয়ে একটি সম্পূর্ণতা দিয়েছেন—এটি সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। তবে শেষাংশে কিছু জায়গায় সামান্য অসঙ্গতি চোখে পড়েছে, আর সমাপ্তিটা আরও একটু গোছানো হতে পারত। তবুও মনে রাখতে হবে, এটি লেখিকার শুরুর দিকের কাজ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে প্রচেষ্টা এবং সম্ভাবনা—দুটোই স্পষ্ট। সব মিলিয়ে, এই বছরের বইমেলায় লেখিকার পাঁচটি বই কেনার সিদ্ধান্ত একেবারেই ভুল ছিল না। বরং বাকি লেখাগুলো পড়ার জন্য এখন আরও বেশি আগ্রহ তৈরি হয়েছে।