হঠাৎ বেডরুমে একটা আলোর শিখা। কোনও মোমবাতি নয়। দেশলাইও নয়। শুধু শূন্যে ভেসে থাকা একটা আগুনের শিখা এগিয়ে আসছে। অন্ধকার এক জিনিস। কিন্তু অন্ধকারে বিন্দুমাত্র আলোর ইশারা এলেই ছায়াগুলো প্রাণ ফিরে পায়। নড়েচড়ে সৃষ্টি করে এক অশরীরী আবেশ। তাতে পাঁজরের হাড়গুলোতে কনকনে বাতাস লাগে। হৃৎপিন্ডে শব্দ ওঠে – ধুক ধুক।
পছন্দসই অলৌকিক বা হরর জঁরের এমন লেখা খুব একটা পাওয়া যায়না যা ভয়ও পাওয়াবে আবার লেখার সাথে জড়িয়েও রাখবে একইসঙ্গে।
অভিষেক চট্টোপাধ্যায়ের পাতালকুহেলি ঠিক এমনই একটা লেখা। যার ভৌতিক লেখা এখন আমার ভীষণ পছন্দের। তেরো নম্বর ফ্লোর এবং মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – সেই যেমন ভয়ানক অভিজ্ঞতার জাল বিস্তার করেছিল, এই লেখাটিও সেরকম অনুভূতি দিতে পারে অনেকটা।
রাহুল, প্রমিত আর আভেরী – তিনজনের এক অদ্ভুত সম্পর্কের সমীকরণে জড়িয়ে রয়েছে এই উপন্যাসের সূত্রপাত। কলেজের বন্ধুত্ব, বিকৃত ভাবনার ভালবাসা এবং রাতের সেমেট্রিতে ভালবাসার পরীক্ষার খেলা তিনজনের জীবনে নিয়ে আসে পরিবর্তন, ভয় এবং রম্যাণী গোস্বামীকে।
আভেরীর হাজ়ব্যান্ড সৌম। সে পাহাড়ে বেড়াতে গেছে তাদের বিবাহবার্ষিকীতে। কিন্তু হঠাৎই ফিরে আসে সে। দ্বিতীয়বার সারপ্রাইজ় দিতে। কিন্তু হঠাৎ একটু বেশিই ভালবাসছে কী সৌম? নাকি তার জীবনের ফেলে আসা সেই অধ্যায় আবার নতুন ভাবে লিখতে শুরু করে তার কাহিনী!

রম্যাণী সাইকোলজির প্রফেসর একইসাথে প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর। স্বপ্ন তাকে আভাস দেয় ভবিষ্যতের। দেখতে পায় ঘটতে চলা অশুভকে। সে স্বপ্নে দেখে এক পাগলকে। যে বারণ করছে এক মেয়েকে বাজারে যেতে, তার বিপদ! কিন্তু সেই মেয়েটিকে চেনেনা রম্যাণী!
তবে দৈব ইচ্ছা মিলিয়ে দেয় তাদের। সাথে তার ধূসর অধ্যায়কে, ভয়কে।
স্নান করতে করতে আভেরীর সামনে এসে যায় এক বীভৎস ফ্যাকাশে সাদা মুখ। রম্যাণীর সাথেও ঘটে একই ঘটনা। বাথরুমের আয়নাতেই। কিন্তু কেন হচ্ছে দুই মেরুর দুজনের সাথে একই ঘটনা?
আর আছে কৃষ্ণদাস মোহান্ত। কে সে? এবং রম্যাণী ও সে কীভাবে জড়িয়ে যায় এই অশুভ শক্তির খেলায়! নাকি কেউ বলে রেখেছিল আগে থেকেই এই ভবিষ্যত! যেমন পাহাড়ের সেই পাগল বলেছিলে, ফিরে আসতেই হবে আবার এখানে। যেখানে রয়েছে তাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া রাত আর সেই পাহাড়ের ত্রাস – জনের কবর।
ভয়ের সাথে সাথে এই উপন্যাসে রয়েছে এক মনস্তাত্বিক দিক। যা ঘিরে থাকে সমগ্র উপন্যাসেই।
একটি ভীষণই আকর্ষণীয় আঙ্গিক রয়েছে এই উপন্যাসটিতে। হিন্দুতন্ত্র এবং খ্রিস্টীয় এক্সরসিজম – এই দুই মিলে বেশ এক নতুনত্ব পাওয়া যায় গল্পে। এবং যেভাবে সেটিকে ব্যবহার করা হয়েছে, বেশ উপভোগ্য সেই বর্ণনা।
রাহুল এবং প্রমিত সাথে তাদের মা বাবা – এই সম্পর্কের সাথে যে সমীকরণ এবং যে টুইস্ট এর ব্যবহার করেছেন লেখক সেটি বেশ ভাল ভাবে স্থাপন করতে পেরেছেন।
কয়েকটি বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত কিছু মতামত রয়েছে। যেমন – মিস গোমস চরিত্রটি আরও ভাল পরিণতি পেতে পারত।
সমগ্র লেখাটি বেশ উপভোগ্য, ছেড়ে উঠতে দেয়না একেবারেই। তা সত্ত্বেও থ্রিল এবং জমাটি ব্যাপারটা একটু নুন কম ধরনের লেগেছে। যেমন প্লট ছিল, সেই হিসেবে আরও একটু রহস্যময়তা, থ্রিল যোগ করা যেত কোথাও যেন।
বুনির সাবপ্লটটিতে আর একটু রহস্য, ভয়ের ঘনত্ব যোগ করলে মন্দ হত না।
তবে সমগ্র উপন্যাসটি যেভাবে আমার মত টানা পড়তে না পারা পাঠককে একটানা পড়িয়ে নিয়েছে সেটাই বলে দেয় কতটা উপভোগ্য এই কাহিনীর বিস্তার।
কিন্তু সুমিত্র এবং বুনি কি একই সুতোয় বাঁধা? নাকি অপেক্ষা করছে কোনও এক শক্তিশালী নতুন নেগেটিভ এন্টিটি! কৃষ্ণদাস, চন্দ্রহাস, মিস গোমস্-রা কি আবার ফিরবে? কারণ – ঘটনা শেষ, রহস্য নয়।
পাতালকুহেলি – অভিষেক চট্টোপাধ্যায়।